ঊর্ধ্বমুখিতায় বৈশ্বিক পুঁজিবাজার, রেকর্ড উচ্চতায় ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার সূচক

বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে গত সপ্তাহজুড়ে টালমাটাল লেনদেনের মধ্যেও শেষ দিনে ঊর্ধ্বমুখী ছিল সূচকগুলো।

বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে গত সপ্তাহজুড়ে টালমাটাল লেনদেনের মধ্যেও শেষ দিনে ঊর্ধ্বমুখী ছিল সূচকগুলো। এক্ষেত্রে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) পাশাপাশি কানাডা ও নরওয়ের মতো কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুদহার হ্রাসে পুঁজির প্রবাহ বেড়ে ব্যবসায়িক ও আর্থিক কার্যক্রম আরো জোরালো হবে, বিনিয়োগকারীদের এমন প্রত্যাশা থেকে বৈশ্বিক পুঁজিবাজার এখন ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে, ওয়াল স্ট্রিটের সূচকগুলোও পৌঁছেছে রেকর্ড উচ্চতায়। খবর রয়টার্স।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটে লেনদেনের শেষ দিন শুক্রবার প্রধান সব সূচকই বেড়েছে। ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ বেড়েছে দশমিক ৩৭ শতাংশ। দিনশেষে সূচকটি পৌঁছেছে ৪৬ হাজার ৩১৫ দশমিক ২৭ পয়েন্টে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬৬৪ দশমিক ৩৬ পয়েন্টে। নাসডাক কম্পোজিট বেড়েছে দশমিক ৭২ শতাংশ। সূচকটি স্থির হয়েছে ২২ হাজার ৬৩১ দশমিক ৪৮ পয়েন্টে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো তিনটি সূচকই রেকর্ড উচ্চতায় ছিল।

বিশ্বের শেয়ারবাজারের সূচক এমএসসিআই অল কান্ট্রি ইনডেক্সও নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে। সূচকটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮২ দশমিক ২৯ পয়েন্টে, যা সপ্তাহজুড়ে প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি।

ইউরোপের শেয়ারবাজারে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। সপ্তাহ শেষে সামান্য পতন হয়েছে লেনদেনে। গত শুক্রবার ইউরোপের প্রধান সূচক স্টক্স ইউরোপ ৬০০ কমে নেমেছে দশমিক ১৬ শতাংশে। পুরো সপ্তাহে সূচকটির পতন দাঁড়িয়েছে দশমিক ১৩ শতাংশে।

গত সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের নজর ছিল বড় বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহারসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ গত বুধবার সুদহার কমিয়েছে ২৫ বেসিস পয়েন্ট। ডিসেম্বরের পর এটিই প্রথমবার সুদ কমাল ফেড। একই সময় কানাডা ও নরওয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সুদহার কমিয়েছে। এতে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব আরো জোরদার হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সুদহার কমলে ঋণগ্রহণের খরচ কমে যায়। ফলে মূলধনপ্রবাহ বাড়ে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়। এ কারণেই শেয়ারবাজারে নতুন করে প্রাণ ফিরে এসেছে।

তবে ফেড এখনো স্পষ্টভাবে ধারাবাহিক সুদহার হ্রাসের নিশ্চয়তা দেয়নি। তাদের অবস্থান হলো প্রতিটি বৈঠকে নতুন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সামান্য অনিশ্চয়তা দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে মূলত সন্তুষ্ট মনোভাব দেখা গেছে।

বিনিয়োগ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফার, মিলার অ্যান্ড ওয়াশিংটনের প্রধান নির্বাহী মাইকেল ফার বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ শেয়ারবাজারের দৃষ্টি ছিল ফেডের বৈঠকের দিকে। বৈঠকের সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা হতাশা থাকলেও সামগ্রিকভাবে ফলাফল নিয়ে সবাই সন্তুষ্টির কথা জানাচ্ছেন। শেয়ারবাজারে যে স্থিতিশীল প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা প্রমাণ করে বিনিয়োগকারীরা মূলত আশাবাদী।’

জাপানের নিক্কেই সূচক কমেছে দশমিক ৫৭ শতাংশ। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব জাপান ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বিক্রি শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় সূচকটিতে পতন দেখা গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অন্যান্য অঞ্চলে শেয়ারসূচকে ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শেয়ারবাজারে এখন নতুন প্রভাবক খোঁজা হচ্ছে। সামনের মাসে শুরু হবে আয়ের তথ্য প্রকাশের মৌসুম। তখন বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন বাজারে বড় ভূমিকা রাখবে। আগে যতটা গুরুত্ব দেয়া হতো, এবার তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাবে এসব প্রতিবেদন। কারণ বিনিয়োগকারীরা জানতে চাইবেন, শুল্ক ও সুদহার কমার প্রভাব কোম্পানিগুলোর মুনাফায় কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

মাইকেল ফার মনে করেন, ‘অক্টোবরে আয়ের মৌসুম শুরু হলে সেসব প্রতিবেদন ফেডের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ তখন বোঝা যাবে, শুল্কনীতি আসলেই কোম্পানির মুনাফায় প্রভাব ফেলছে কিনা।’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ প্লাটফর্ম বেল কার্ভ ট্রেডিংয়ের প্রধান কৌশলবিদ বিল স্ত্রাজুল্লো বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদে শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখাচ্ছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি এতটা সহজ নয়। ফেড এখন শ্রমবাজারের ঝুঁকি বিবেচনা আমলে নিয়ে আরো বেশি সুদহার কমানোর দিকে ঝুঁকতে পারে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যোগাযোগও পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলেছে। টানা তিন মাস পর ফোনালাপ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তারা টিকটক ইস্যুতে অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি ছয় সপ্তাহের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। বৈঠকের আলোচনায় বাণিজ্য, মাদক পাচার ও ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ও থাকবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে বাজেট সংকট এখনো রয়ে গেছে। শুক্রবার সিনেটে একটি অস্থায়ী ব্যয়ের বিল পাস হয়নি। বিলটি পাস না হলে ১ অক্টোবর থেকে সরকার আংশিকভাবে বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড শুক্রবার কিছুটা বেড়েছে। ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৩ শতাংশে। দুই বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড পৌঁছেছে ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশে।

ডলার সূচক টানা তৃতীয় দিনে বেড়ে হয়েছে ৯৭ দশমিক ৬৭। যদিও পুরো সপ্তাহে সূচকটি কমেছে। সুইস ফ্রাঁর বিপরীতে ডলার বেড়েছে দশমিক ৪ শতাংশ। তবে জাপানি ইয়েনের বিপরীতে প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। ইউরোর বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১ ডলার ১৭ সেন্টে। ব্রিটিশ পাউন্ডের বিনিময় হার দুর্বল হয়ে নেমেছে ১ ডলার ৩৪ সেন্টে।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে। তবে আগে কেনা সরকারি বন্ড বিক্রির গতি কমিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সপ্তাহজুড়ে শেয়ারবাজারে ইতিবাচক মনোভাব ছিল প্রবল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহার হ্রাস বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। যদিও সামনে এখনো ঝুঁকি রয়ে গেছে, বিশেষ করে বাণিজ্যনীতি, ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন ও বাজেট সংকটের। আগামী দিনে শেয়ারবাজার কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করবে করপোরেট আয়ের তথ্য ও ফেডের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

আরও